দেশে সাম্প্রতিক হাম রোগের প্রাদুর্ভাব: সরকারি কার্যক্রম ও পরিকল্পনা সঠিক পথেই রয়েছে, তবে…

বর্তমানে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণের একটি উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ এবং রাজধানী ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছর ধরে দেশে হামের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চললেও ২০১৮ সালের পর কোনো বড় ধরনের বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়নি, যা এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মাধ্যমে নতুন করে হামের টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এপ্রিল ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকার সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। একই সাথে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ (ICU), ভেন্টিলেটর এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ড স্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধির জোর তৎপরতা চলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বর্তমানে ১০টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ জেলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি এবং আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কাজ করছে।

প্রাদুর্ভাবের বর্তমান পরিস্থিতি ও মৃত্যুহার

২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামের সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারি আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার এবং জটিলতা অত্যন্ত বেশি।

আঞ্চলিক চিত্র এবং পরিসংখ্যান:

  • রাজশাহী অঞ্চল: গত এক মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯ জন শিশু আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সংক্রমণের হার পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় সবচেয়ে বেশি।
  • ময়মনসিংহ অঞ্চল: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে ৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে এই হাসপাতালে ৬৬ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে।
  • ঢাকা (মহাখালী): মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ বছর ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৫৬০ জন হামের রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং সেখানে ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

সংক্রমণের প্রকৃতি:

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ; একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জন সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে অনেক শিশু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এবং যথাযথ পুষ্টির অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।

হাসপাতাল বা এলাকার নাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মৃতের সংখ্যা সংক্রমণের সময়কাল বিশেষ ব্যবস্থা বা পরিকাঠামো ভ্যাকসিন বা ওষুধের স্থিতি
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ৫৬০ (২৯ মার্চ পর্যন্ত) ২২ জানুয়ারি ২০২৬ – চলমান জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চালু, পৃথক ওয়ার্ড ও ভেন্টিলেটর সরবরাহ। ইউনিসেফ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৬৬ (ভর্তি) ৫ (১২ দিনে) মার্চ ২০২৬ তিনটি পৃথক ‘হাম কর্নার’ এবং আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি। সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৪৪ (পজিটিভ) ১২ (মার্চ মাসে) মার্চ ২০২৬ ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার স্থাপন; নতুন ভেন্টিলেটর প্রেরণ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভ্যাকসিন আসার সম্ভাবনা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৭০ (ভর্তি) ৪ (গত তিন মাসে) ২০২৬ আক্রান্তদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন।
পাবনা ২৬ (ভর্তি) ০ (এখন পর্যন্ত মৃত্যু নেই) মার্চ ২০২৬ আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসার ব্যবস্থা। টিকা আসার পর দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার হবে।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল Not in source Not in source ৩০ মার্চ ২০২৬ (নির্দেশনা) ৪০টি নতুন আইসিইউ বেড প্রস্তুত করার নির্দেশ।

সরকারি পদক্ষেপ ও ভ্যাকসিন সংগ্রহ কৌশল

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে টিকাদান এবং চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।

টিকা সংগ্রহ ও অর্থায়ন:

  • বাজেট বরাদ্দ: টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।
  • ইউনিসেফ থেকে ক্রয়: সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা সংগ্রহ করছে। স্বাস্থ্য সচিবের তথ্য অনুযায়ী, টিকার মূল্য ইতিমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকার সরবরাহ শুরু হবে।
  • টিকাদান কর্মসূচি: টিকা আসার সাথে সাথে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে একটি দেশব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন:

  • আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর: রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ চালু এবং ২০টি নতুন ভেন্টিলেটর ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীতে ইতিমধ্যেই নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানো হয়েছে।
  • বক্ষব্যাধি হাসপাতাল: জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দ্রুততম সময়ে ৪০টি নতুন আইসিইউ বেড প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
  • আইসোলেশন ব্যবস্থা: দেশের ১০টি বড় হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা বিশেষ ওয়ার্ড বা ‘হাম কর্নার’ চালু করা হয়েছে যাতে সাধারণ রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সংকট

সরকার তৎপরতা চালালেও মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিকূলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জের ধরণ বিস্তারিত বিবরণ
শয্যা ও জনবল সংকট হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপের তুলনায় বেড এবং নার্স/ডাক্তারের সংখ্যা অপ্রতুল। বিশেষ করে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে জায়গার অভাবে রোগীদের চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটছে।
আইসিইউ প্রাপ্যতা রাজশাহীতে অনেক শিশুকে আইসিইউ-তে নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও সক্ষমতার অভাবে অনেক সময় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আইসিইউ পাওয়ার আগেই কিছু শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।
টিকাদানের ঘাটতি ২০১৮ সালের পর কোনো বড় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় একটি বড় সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচিতে এমআর-১ এবং এমআর-২ ডোজের কভারেজও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কোনো কোনো হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়ায় অন্যান্য শিশুদের মধ্যেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিআই (EPI) ও সার্ভিল্যান্স বিভাগের মতে, হামের এই আকস্মিক বিস্তারের পেছনে গত কয়েক বছরের টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা কাজ করছে। এছাড়া কর্মজীবী মায়েদের শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়াকেও শিশুদের কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সুপারিশকৃত পদক্ষেপসমূহ:

১. ক্যাম্পেইন জোরদার: দ্রুততম সময়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা এবং বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা নিশ্চিত করা।

২. জনসচেতনতা: হামের লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেশনে রাখা।

৩. ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন সাপোর্ট: জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর এবং হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৪. টেকনিক্যাল বৈঠক: কেন ৯ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তা পর্যালোচনার জন্য জরুরি কারিগরি সভার আয়োজন করা।

সরকার সঠিক পথেই রয়েছে, তবে…

বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের সময়োপযোগী অর্থ বরাদ্দ এবং টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। মাঠ পর্যায়ে এর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সরকার সেদিক্টেও নজর দিয়েছে। জানা গেছে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই টিকা এসে যাবে দেশে। দ্রুত বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে। তবে মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে এখনি মাইক্রোপ্লানিং এবং যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

আপনার চিন্তাগুলোকে ছোট বা মাঝারি আকারে লিখে পাঠান। আপনি ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ বা এ ধরণের গ্রুপে যে কথাগুলো লিখছেন সেগুলোর একটি কপি আমাদের কাছেও পাঠান। আমরা সেগুলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবো। মতামত গড়ে তুলবো। ইমেইল (ajss@hdonline.net) বা এই লিংকে ক্লিক করে লেখা পাঠাতে পারেন।

Leave a Comment