বাংলাদেশে বর্তমানে হাম-রুবেলার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যেখানে আক্রান্তদের প্রায় ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫ এপ্রিল ২০২৬ (রবিবার) থেকে একটি জরুরি এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এই প্রাদুর্ভাবে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানি ঘটেছে এবং সংক্রমণ দেশের ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার প্রাথমিকভাবে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু করছে এবং পরবর্তীতে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে দেশে হামের সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিচে তুলে ধরা হলো:
ক) সংক্রমণ ও মৃত্যুর তথ্য (১৫ মার্চ – ৪ এপ্রিল ২০২৬)
| ক্যাটাগরি | পরিসংখ্যান (সামগ্রিক) | গত ২৪ ঘণ্টার চিত্র (৪ এপ্রিল) |
| মোট সন্দেহভাজন আক্রান্ত | ৬,৪৭৬ জন | ৭৮৭ জন |
| ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত আক্রান্ত | ৮২৬ জন | ৬০ জন |
| সন্দেহভাজন মৃত্যু | ৯৮ জন | ৪ জন |
| নিশ্চিত মৃত্যু | ১৬ জন | ২ জন |
| সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন | ২,৬৫৪ জন (৩ এপ্রিল পর্যন্ত) | – |
খ) জনমিতি ও বিস্তৃতি
- বয়সভিত্তিক ঝুঁকি: মোট আক্রান্তের ৮২ শতাংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
- ভৌগোলিক বিস্তৃতি: ইতিমধ্যে দেশের ৫৬টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, ঢাকা এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে একযোগে বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু করছে।
কর্মসূচির মূল বৈশিষ্ট্য:
- লক্ষ্যমাত্রা: ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস (৫ বছরের কম) বয়সী সকল শিশুকে টিকা প্রদান করা হবে।
- পূর্বশর্ত: শিশু আগে টিকা নিয়ে থাকুক বা না থাকুক, এই কর্মসূচির আওতায় তাকে পুনরায় টিকা নিতে হবে।
- সময়সীমা: প্রথম পর্যায় ৫ এপ্রিল শুরু হয়ে ধাপে ধাপে ২১ মে’র (ঈদুল আযহার আগে) মধ্যে দেশব্যাপী সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- টিকাদান কেন্দ্র: নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার এবং স্থানীয় নির্ধারিত ভেন্যুতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টিকা দেওয়া হবে।
প্রথম পর্যায়ের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা (৩০টি উপজেলা/পৌরসভা):
প্রথম পর্যায়ে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো:
- ঢাকা বিভাগ: নবাবগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ সদর, লৌহজং, শ্রীনগর, গাজীপুর সদর, মাদারীপুর সদর, শরীয়তপুরের জাজিরা।
- রাজশাহী বিভাগ: গোদাগাড়ী, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া, পোরশা (নওগাঁ), নাটোর সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট।
- অন্যান্য এলাকা: চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার (মহেশখালী ও রামু), চাঁদপুর সদর ও হাইমচর; বরিশাল বিভাগের মেহেন্দীগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি, বরগুনা সদর; ময়মনসিংহ বিভাগের ত্রিশাল, সদর ও ফুলপুর এবং যশোর সদর।
প্রশাসনিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত পদক্ষেপ
ক) জনবল ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা
- ছুটি বাতিল: পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের অর্জিত ও নৈমিত্তিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
- বেসরকারি সহযোগিতা: বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে একটি নতুন বহির্বিভাগ ইউনিট নির্মাণ করেছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তিনটি ভেন্টিলেটর প্রদান করেছে।
খ) চিকিৎসা নির্দেশনা
- ভিটামিন-এ ক্যাপসুল: হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের জটিলতা কমাতে টিকার পাশাপাশি ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেওয়া হবে।
- অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে: যেসব শিশুর জ্বর বা অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- জটিলতা: চিকিৎসকদের মতে, হাম থেকে পরবর্তীতে নিউমোনিয়া এবং এনসেফালাইটিসের (মস্তিষ্কের প্রদাহ) মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
- উচ্চ আদালতে রিট: হামের সংক্রমণ রোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরাসরি ক্লাস বন্ধ করে অনলাইন ক্লাস চালু করা এবং সঠিক মৃত্যুহার ও টিকাদানের তথ্য আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
- গুজব প্রতিরোধ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্থানীয় নেতা ও গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: ইউনিসেফ (UNICEF) প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
“বাংলাদেশে হাম-রুবেলায় আক্রান্তদের ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা রবিবার থেকে জরুরি টিকাদান শুরু করছি। প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষিত রাখাই আমাদের লক্ষ্য।” — সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী।
“হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত করতে পারলে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।” — স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।