বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর ব্যাধি নয়, বরং এটি সারা বছরের এক স্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। ২০০০ সালে নতুন করে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এই রোগ ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে এবং বর্তমানে এটি দেশের প্রতিটি জনপদে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ৫৩ দিনেই ১ হাজার ৪৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন মৃত্যুবরণ করেছেন (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।
ডেঙ্গুর বিস্তার ও বর্তমান সংক্রমণের চিত্র
এক সময় ডেঙ্গুকে কেবল ঢাকা বা বড় শহরের রোগ মনে করা হলেও বর্তমানে এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৮ শতাংশই ছিল ঢাকার বাইরের বাসিন্দা (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২৬)। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালের তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোতে সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও এটি এখন দেশের প্রতিটি জনপদের একটি স্থায়ী ব্যাধি। এছাড়া বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর ২৫ শতাংশের বেশি (১,৭০৫ জন) শুধু বাংলাদেশেই ঘটেছে (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২৬)। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ডিইএনভি–২ এবং ডিইএনভি–৩ সেরোটাইপের আধিক্য বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে।
বিস্তারের কারণ ও জলবায়ুর প্রভাব
ডেঙ্গু বিস্তারের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর পরিবর্তনকে চিহ্নিত করা হয়েছে:
- আদর্শ তাপমাত্রা: মশার প্রজননের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২৬)।
- বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন: বর্ষার সময় কম বৃষ্টি এবং বর্ষার পর অতিবৃষ্টি মশার বংশবৃদ্ধিতে ব্যাপক সহায়তা করছে।
- উষ্ণ শীতকাল: শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হওয়ায় মশার বংশবিস্তারের মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
- ব্যবস্থাপনার অভাব: রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এছাড়াও ময়লা-আবর্জনার বিস্তার এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আর্থ-সামাজিক প্রভাব
ডেঙ্গু কেবল স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ই নয়, বরং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারের মাথাপিছু গড় ব্যয় ১৯ হাজার টাকার বেশি (প্রথম আলো, ২ এপ্রিল ২০২৬)। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মানুষের পকেট থেকে কেবল ডেঙ্গু চিকিৎসার পেছনেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে।
প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম ও সরকারি উদ্যোগ
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে:
- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি): মশার উপদ্রব কমাতে ডিএনসিসি ‘শনিবারের অঙ্গীকার—বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ শীর্ষক বিশেষ মশক নিধন অভিযান শুরু করেছে (প্রথম আলো, ১৩ মার্চ ২০২৬)। সংস্থাটি বর্ষার আগেই মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে ৫৩টি বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ২৫টি ওয়ার্ডে এই অভিযান জোরালো করা হয়েছে।
- জেলা প্রশাসন: ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রম ভিত্তিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে (প্রবাসীর দিগন্ত, ১ এপ্রিল ২০২৬)। জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমান নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
- মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এছাড়া সংক্রমণের হার নিরূপণে সেরোলজিক্যাল জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই মশার উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করতে হবে (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। নাগরিক সচেতনতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে ডেঙ্গুর এই ক্রমবর্ধমান বিস্তার রোধ করতে।