আপনার শিশু কি টিকার বয়সের আগেই হামের ঝুঁকিতে? জেনে নিন ৫টি জরুরি তথ্য ও সুরক্ষার উপায়

ভূমিকা: একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ

বর্তমানে বাংলাদেশে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত হামের টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে দেওয়া হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে দেখা যাচ্ছে যে এর চেয়েও কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১,৫০০ ছাড়িয়েছে এবং এই সংক্রমণ এখন আর নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার শিশু পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পাওয়ায় এই স্বাস্থ্য সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এই ব্লগের মাধ্যমে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন টিকার বয়সের আগেই শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এই জরুরি পরিস্থিতিতে আপনার সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কী।

কেন ৯ মাসের আগে সাধারণত হামের টিকা দেওয়া হয় না? (বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যা)

হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সকে বেছে নেওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। একজন মা যদি আগে হামের টিকা নিয়ে থাকেন বা কখনো হামে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে তাঁর শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি গর্ভাবস্থায় শিশুর দেহে স্থানান্তরিত হয়। এই অ্যান্টিবডি জন্মের পর কয়েক মাস পর্যন্ত শিশুকে সুরক্ষা দেয়।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে: এই সময়ের মধ্যে শিশুকে টিকা দেওয়া হলে মায়ের শরীর থেকে পাওয়া ওই অ্যান্টিবডি টিকার উপাদানগুলোকে ‘নিউট্রিলাইজ’ বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে টিকা আর কার্যকর হয় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী-র তথ্য অনুযায়ী, ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দিলে তা প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। অন্যদিকে, ৬ মাস বয়সে এই টিকা দেওয়া হলে এর কার্যকারিতা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

বিশ্লেষকের তথ্য: বর্তমানে প্রাদুর্ভাবের একটি বড় কারণ হলো সব মায়ের দেহে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি নেই। যদি মা নিজে টিকা না নিয়ে থাকেন বা আগে সংক্রমিত না হন, তবে তাঁর শিশু জন্মগতভাবে কোনো সুরক্ষা পায় না, যা তাকে ৯ মাস বয়স হওয়ার আগেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি যখন ভিন্ন: বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ও ৬ মাসের নতুন পরিকল্পনা

দেশের বর্তমান জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির স্বর্ণমান (৯ মাস ও ১৫ মাস) বজায় রেখেই জুন মাস থেকে এক মাসব্যাপী একটি বিশেষ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই কর্মসূচির মূল তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • জরুরি পদক্ষেপ: বিশেষ এই কর্মসূচিতে ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়স থেকেই শিশুদের টিকার আওতায় আনা হবে। মনে রাখবেন, এটি একটি সাময়িক ও জরুরি ব্যবস্থা; নিয়মিত কর্মসূচিতে টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাসই থাকছে।
  • লক্ষ্যমাত্রা: প্রায় ২ কোটি শিশুকে এই কর্মসূচির মাধ্যমে সুরক্ষিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
  • বাজেট ও সংগ্রহ: টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই অর্থে ইউনিসেফের মাধ্যমে হামসহ ১০ ধরনের টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিউমোনিয়ার ঝুঁকি এবং ৩০০ টাকার অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি (বাবল সিপ্যাপ)

হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য সবথেকে বড় ভীতি হলো নিউমোনিয়া। আইসিডিডিআরবি-র (icddr,b) তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে, যার মধ্যে ৬ মাস থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা সবথেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি কমাতে আইসিডিডিআরবি উদ্ভাবিত ‘বাবল সিপ্যাপ’ (Bubble CPAP) প্রযুক্তি এক যুগান্তকারী সমাধান।

“এই প্রযুক্তিটি প্রচলিত মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী—যার প্রতিটি ইউনিটের নির্মাণ খরচ মাত্র ৩০০ টাকার মতো।”

বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত সাধারণ অক্সিজেন পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এটি ইতোমধ্যে ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশে সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এটি শিশুর প্রাণ বাঁচাতে অবিশ্বাস্য ফল দিচ্ছে।

ভিটামিন ‘এ’ এবং অপুষ্টির ভূমিকা

অপুষ্টি এবং ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যেসব শিশু নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পায় না, তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার এবং পরবর্তীকালে জটিলতায় ভোগার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই শিশুকে হাম থেকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক ডোজে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিশ্চিত করা এবং ৬ মাস বয়সের পর থেকে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো অপরিহার্য।

ঘরোয়া সুরক্ষা এবং বিপদের লক্ষণ: বাবা-মায়ের জন্য গাইডলাইন

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. কাকলী হালদার ও ডা. তাসনুভা খান-এর পরামর্শ অনুযায়ী, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষায় নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:

  • পরিচ্ছন্নতা: শিশুকে স্পর্শ করার আগে সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন।
  • আলাদা রাখা ও মাস্ক: পরিবারের কারও জ্বর বা র্যাশ (Rash) হলে তাকে আলাদা রাখুন। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে শিশুকে যেতে দেবেন না এবং প্রয়োজনে বড়রা মাস্ক ব্যবহার করুন।
  • পুষ্টি: নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। ৬ মাস পূর্ণ হলে পুষ্টিকর বাড়তি খাবার দিতে হবে।
  • সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে প্যারাসিটামলের মতো সাধারণ ওষুধও দেবেন না, কারণ ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক ডোজ জানা অত্যন্ত জরুরি।

কখন দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে? নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসপাতালে নিন:

  • শ্বাসকষ্ট হলে।
  • খিঁচুনি দেখা দিলে।
  • বারবার বমি বা ডায়রিয়া হলে।
  • কান থেকে পুঁজ বা পানি পড়লে (কান পাকা)।
  • শিশু অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে।

উপসংহার: ভবিষ্যৎ ভাবনা

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। রাজশাহীতে ২০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরও তা এখনো চালু হয়নি; এটি দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যা অত্র অঞ্চলের চিকিৎসা সেবার চাপ কমিয়ে আনবে। এছাড়া নতুন ভেন্টিলেটর সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে এই মহামারি রুখতে। আপনার চারপাশের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আপনি কি নিয়মিত টিকাদান এবং সচেতনতার বিষয়ে সজাগ আছেন? আপনার একটি সঠিক সিদ্ধান্তই পারে একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে।

আপনার চিন্তাগুলোকে ছোট বা মাঝারি আকারে লিখে পাঠান। আপনি ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ বা এ ধরণের গ্রুপে যে কথাগুলো লিখছেন সেগুলোর একটি কপি আমাদের কাছেও পাঠান। আমরা সেগুলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবো। মতামত গড়ে তুলবো। ইমেইল (ajss@hdonline.net) বা এই লিংকে ক্লিক করে লেখা পাঠাতে পারেন।

Leave a Comment